১১৪। সূরা আন নাস (মানবজাতি)
সুরার সারসংক্ষেপঃ আশ্রয় চাওয়াই হলো এই সূরার মূল বক্তব্য। আশ্রয় সম্পর্কিত ২ টি বিষয় এখানে ফুটে উঠেছে।
১। এক সত্তার কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে
২। কিছু হতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে
১ম ৩ আয়াতে যে সত্তার কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে তার পরিচয় দেওয়া হয়েছে এবং বাকি আয়াতগুলোতে কি কি হতে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে তা বর্ননা করা হয়েছে।
১ম আয়াতের ১ম শব্দ ‘ক্বুল’ এর তাৎপর্য অনেক। আল্লাহ এখানে ‘ক্বুল’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন কারন তিনি চান মানুষ তাঁর দূর্বলতাকে মুখে প্রকাশ করুক। মুখে প্রকাশ করা বা বলার মাধ্যমে অহংকার দূর হয়, আমার কোন সাহায্য, আশ্রয়ের দরকার নাই এমন চিন্তা দূরিভুত হয়। মুখে বলে আশ্রয় চাওয়ার কারনে রবকে মান্য করার বিষয়টি চলে আসে। আমি যাকে মান্য করি তাঁর কাছেই চাইতে পারি। এজন্য ‘ক্বুল’ শব্দ ব্যবহার করে আল্লাহ তাঁর বান্দাহকে তাঁর অনুগত বাধ্যগত থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন। এই সূরার শেষে শয়তানের কথা এসেছে যে কিনা আল্লাহর আনুগত্য করেনি। মানুষকে আল্লাহ আনুগত্যের শিক্ষা দিয়েছেন। এছাড়া শুধু নিজে নয়, অন্যকেও বলার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার জন্যও ‘ক্বুল’ এর তাৎপর্য রয়েছে।
১ম-৩য় আয়াতে একান্ত কাতর কন্ঠে আল্লাহকে ডাকা হচ্ছে। আল্লাহর ৩ টি শক্তিশালী পরিচয় এখানে উল্লেখ করা হয়েছেঃ রব, মালিক, ইলাহ। এগুলোর মাধ্যমে ডেকে আল্লাহর কাছে শক্তিশালী এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে।
রব শব্দটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। একটি মাত্র শব্দ দিয়ে অনেক অর্থ বুঝায়। রব শব্দটি দ্বারা একই সাথে মালিক, পরিপূর্ন কর্তৃত্বশীল, বৃদ্ধি নিশ্চিতকারী, পরিচালনাকারী, অস্তিত্ব রক্ষাকারী, পুরষ্কার প্রদানকারী ইত্যাদি বুঝায়। অল্প কথায় বলা যায় যে, রব হলেন সেই মালিক যিনি পরিপূর্ন কর্তৃত্বশীল থেকে অস্তিত্ব রক্ষা করে লালন-পালন করে বৃদ্ধি নিশ্চিত করা সহ পূর্ণতায় পৌঁছান এবং পুরষ্কার দেন।
এই যুগে ফেরাউন হয়তো নেই কিন্তু শয়তান তো আছে। শয়তান ও ফেরাঊনের মত অনেক পথহারা মানুষ অন্যকে কুমন্ত্রনা দান করছে ও বিভ্রান্ত করছে। যার ফলে নিজের কামনা বাসনাকে ‘ইলাহ’ বানিয়ে নেওয়া মানুষ অনেক। যার প্রমান এই আয়াতটিঃ “তুমি কি কখনো সেই ব্যক্তির অবস্থা ভেবে দেখেছো যে তার প্রবৃত্তির কামনা বাসনাকে খোদা বানিয়ে নিয়েছে” (৪৫ তম সূরা আল জাসিয়াহ আয়াত ২৩)। সূরা আন নাস ঐ সব কুমন্ত্রনা ও বিভ্রান্তকারী জ্বীন ও মানুষ থেকে এবং নিজের কামনা বাসনা, ঔদ্ধত্য, আবাধ্যতা থেকে আশ্রয় গ্রহন করে তাওহীদ ও ইসলামকে সমুন্নত ও সুরক্ষিত রাখার মূলমন্ত্র হিসাবে কাজ করে।
৪র্থ আয়াত থেকে জানা যায় শয়তান এর Attack (আক্রমন) হলো ওয়াস ওয়াসা (বার বার কুমন্ত্রণা) আর Defense (প্রতিরক্ষা) হলো বার বার পলায়ন। শয়তান এভাবেই বার বার Attack করে Defense এ চলে যায়
তাই শয়তানের কুমন্ত্রনার কাছ থেকে রেহাই পেতে সবসময় আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
শেষ আয়াতে (৬ষ্ঠ আয়াত) বলা হয়েছে শয়তান হতে পারে জ্বীন বা মানুষের মধ্য থেকে। মানুষের মধ্য থেকে শয়তান তখনই আবির্ভুত হয় যখন মানুষ শয়তানকে তার হৃদয়ে জায়গা দেয় ও কন্ট্রোলের সুযোগ দেয়। তখন মানুষটিই শয়তানের সমতূল্য হয়ে যায়, এবং অন্যকেও কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। বক্ষে শয়তানকে জায়গা না দিয়ে আল্লাহকে জায়গা দিয়ে এবং মুখে ও মনে মনে আঊযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতনীর রজীম বলে শয়তানের কাছ থেকে পানাহ চাওয়ার মাধ্যমে মানুষকে তার চরম শত্রুর সাথে মোকাবেলার শিক্ষা দিয়েছেন আল্লাহ।
জীন শয়তান ও মানুষ শয়তান মানুষের বক্ষ বা বুকে প্রভাব সৃষ্টি করে। Emotional distress, stress, anxiety, fear ইত্যাদির কারন ও এরা হতে পারে, এই দুইয়ের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক আল্লাহ তাই তিনি অবশ্যই তাদের চেয়ে শক্তিশালী। তাই আমাদের আশ্রয় চাওয়া উচিৎ আল্লাহর কাছে।
আল কুরআনের এই শেষ সূরায় মানুষ এর সবাচাইতে আপন ও শুভাকাঙ্খী হিসাবে আল্লাহ নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আর সাথে সাথে সবচাইতে ক্ষতিকর শত্রুঃ শয়তানকেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। শয়তানের প্ররোচনা থেকে বেঁচে আল্লাহর আনুগত্য করাই মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য। এটি আল্লাহ বোঝাতে চেয়েছেন ‘মানুষ’ নামের এই সূরায়।
এখানে বার বার ‘নাস’ শব্দটি এসেছে। এই শব্দটির ক্রিয়ামূল নাসিয়া অর্থ ভুলে যাওয়া। মানুষ বার বার ভুলে যায় এজন্য তাঁর নাম নাস। এখানে আল্লাহ মানুষকে বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর রব, মালিক, ইলাহের ব্যাপারে এবং রতার সম্ভাব্য ত্রুটি থেকে পরিত্রানের জন্য আশ্রয় চাইতে বলছেন।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আল কুরআনের শেষ (১১৪ তম) সূরা আন নাস। এই সূরার শুরুতেই আল্লাহর ৩ টি পরিচয়ের কথা বলে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। ‘রব্ব’, ‘মালিক’ ও ‘ইলাহ’ এই পরিচয় ৩ টি তাওহীদের ৩ টি মৌলিক উপাদান। এই সূরার আগের সূরা (১১৩ তম) আল ফালাকেও আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। তারও আগের সূরা (১১২ তম) আল ইখলাস এর মূল বিষয় হলো তাওহীদ ও আল্লাহর পরিচয়। একে Touch stone of theology ও বলা যায় মানে ধর্মতত্তের পরশপাথর। ১১২ তম সূরায় তাওহীদ ও ইসলামের মূলবিষয়বস্তু কে বর্ননা ও প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে এবং পরের ২ সূরায় তা বজায় রাখা ও সমুন্নত রাখার জন্য প্রতিরক্ষা কবচ হিসাবে অবতীর্ন হয়েছে। সূরা আল ফালাক হলো বাহ্যিক আক্রমন থেকে তাওহীদ ও ইসলামকে প্রতিরক্ষার কবচ আর সূরা আন নাসহলো আভ্যন্তরীন আক্রমন থেকে তাওহীদ ও ইসলামকে প্রতিরক্ষার কবচ
সূরা ফালাকে বর্নিত ৪ টি বিপদ ও ক্ষতিগুলো শারীরিক ক্ষতি/বিপদ যা দুনিয়া সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে সূরা আন নাসে বর্নিত ১ টি ক্ষতি/বিপদ দুনিয়ার পাশাপাশি আখিরাত এও প্রভাব ফেলে যার ফলে এটি বেশি মাত্রায় ক্ষতিকর। এইজন্য সূরা ফালাকে আল্লাহর ১ টি নাম, পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বর্ননা করা হলেও সূরা আন নাসে ৩ টি নাম, পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বর্ননা করা হয়েছে। তাকে বেশি বেশি স্মরন করে তার কাছে বেশি করে সাহায্য ও আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
সূরা আল ফাতিহা তে হেদায়াত চাওয়া হয়েছে। এই সূরায় আল্লাহ হেদায়াত, পথ দেখিয়েছেন এবং গায়েব এর উপর বিশ্বাসের কথা বলেছেন, আর শেষ সূরা আন নাসে বলা হয়েছে যে শয়তান মানুষের মনে বার বার কুমন্ত্রনা দিতে থাকে। শয়তান আসলে মানুষকে এই সহজ সরল পথ থেকে দূরে রাখতে চায়। তাই শুরু থেকেই সহজ সরল পথ আল্লাহর কাছে চাওয়া হয়েছে, আল্লাহ দিয়েছেনও এবং শেষ পর্যন্ত এই পথে থাকতে হবে শয়তানের কুমন্ত্রনা মোকাবেলা করেই।
কাব্য, ছন্দ পারদর্শিতার আরব যুগে আল কুরআন দিয়েছে শৈল্পিক কাব্য, ছন্দের অনন্য উদাহরন। একারনে ঐ যুগেও আল কুরআন ছিল এক বিস্ময়কর সাহিত্য। সূরার সব আয়াতের শেষেই আন নাস তথা س (সীন) এর অপূর্ব ছন্দ পাওয়া যায়
আল কুরআনের ১ম সূরা আল ফাতিহা। যার অর্থ শুরু বা সূচনা বা প্রারম্ভিকা। ২য় সূরা আল বাকারা; যার অর্থ গরু। আর ১১৪ তম সূরা অর্থাৎ শেষ সূরা আন নাস এর অর্থ হলো মানুষ। বিষয়টা এমন ভাবে দেখা যেতে পারে/ চিন্তা করা যেতে পারে যে; আল কুরআন শুরু করে শেষ পর্যন্ত ভালোভাবে বুঝে আয়ত্ব করতে পারলে বুদ্ধি বিবেকহীন চতুর্পদ জন্তু হতে মানবিক গুনাবলী অর্জন করে মানুষ এ পরিনত হওয়া যাবে।









.jpg)
%20(5).jpg)




মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন